
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রামের চারটি আসনে ফলাফলের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন নারী ভোটাররা। ভোটার সংখ্যার বিচারে এই জেলায় পুরুষদের চেয়ে নারীরাই এগিয়ে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, কুড়িগ্রাম জেলায় নারী ভোটার ৫০ দশমিক ২২ শতাংশ, যেখানে পুরুষ ভোটার ৪৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। চারটি আসনেই পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এত বিপুল সংখ্যক নারী ভোটার থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে কুড়িগ্রামে কোনো নারী প্রার্থী নেই। যদিও একজন নারী প্রার্থী প্রাথমিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন, পরে হাইকোর্ট তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনের ৭৩টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ জন এবং নারী ভোটার ৯ লাখ ৫৪ হাজার ২০৯ জন। পাশাপাশি হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৪ জন।
গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দশম সংসদ নির্বাচনে চারটির মধ্যে তিনটি আসনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং একটি আসনে জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) মনোনীত প্রার্থী জয় লাভ করেন। সে সময় কুড়িগ্রামকে জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই ‘দুর্গ’ ভেঙে পড়ে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে একটি আসন জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ধরে রাখলেও বাকি তিনটি আসনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। পরবর্তীতে বিএনপি ও জামায়াতবিহীন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুটি আসনে জয় পেলেও কুড়িগ্রাম-২ আসনে দলীয় জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিকে হারিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং কুড়িগ্রাম-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রার্থী বিজয়ী হন।
এদিকে নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে নারীদের জন্য প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি বলে তাঁদের একটি বড় অংশ মনে করেন। ফলে এবারের নির্বাচনে তাঁরা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে যোগ্যতা, সততা ও এলাকার উন্নয়নের ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ভোট দিতে চান।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের তরুণ মোঃ জাহিদুর রহমান লিমন বলেন, ‘আমি এমন কাউকে ভোট দেব না, যিনি ভোটের আগে আসেন আর ভোটের পরে চিনতেই চান না এবং অবহেলিত করে রেখেছে শিক্ষা চিকিৎসা সর্বস্তরের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করে রেখে এবার আমরা । যার চিন্তা-চেতনা ভালো, মানুষের পাশে থাকবে—তাকেই ভোট দেব।’
আরেক নারী ভোটার মোচ্ছাঃ শিউলি বেগম বলেন, ‘কুড়িগ্রামের নারীসহ সবার উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার কর্মসংস্থান। আমাদের জমি আছে, শ্রমশক্তি আছে, কিন্তু কাজ নেই। তাই মানুষ বাধ্য হয়ে ঢাকা বা অন্য জেলায় চলে যায়। এখানে যদি কলকারখানা গড়ে উঠত, তাহলে স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং জেলার অর্থনীতি শক্তিশালী হতো।’
তবে সব নারী ভোটার এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। কেউ কেউ কাকে ভোট দেবেন, কোন প্রার্থী নারীর উন্নয়নে সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারবেন—তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। এমনই একজন ভোটার শামসাদ বলেন, ‘প্রার্থীদের সবাইকে চিনি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—নারীর উন্নয়নে কে আসলে কাজ করবেন?’ তবে তিনি যোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা জানান।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা মহিলা দলের সভাপতি রেশমা সুলতানা বলেন ‘জেলায় নারী ভোটারের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি। তাই আমরা নারী ভোটারদের আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতোমধ্যে আমাদের দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তাঁদের জানানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের কাছে আমাদের অতীত সাফল্য ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি তুলে ধরা হবে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি শাহজালাল সবুজ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী নারী। মহিলা বিভাগের কর্মীরা প্রার্থী, জোট এবং ভোটের বার্তা নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছেন। আমরা বিশ্বাস করি, নারীদের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারব।’
সব মিলিয়ে কুড়িগ্রামের নির্বাচনী মাঠে নারী ভোটাররা এবার শুধু সংখ্যায় নয়, সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
Leave a Reply